মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণের দৌড়ে এগিয়ে ইরান

সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান একের পর এক উচ্চাভিলাষী পদক্ষেপ নিচ্ছেন। রাজতন্ত্র শাসিত তেল সমৃদ্ধ রক্ষণশীল উপসাগরীয় দেশটির খোলনলচে বদলে দিতে তিনি এখন সদাই ব্যস্ত। সৌদি শাসকদের দৃষ্টিতে ইরানই তাদের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইরানের স্বার্থ তাই তাদের টার্গেট। ইয়েমেনে চলমান সামরিক অভিযান তারই অংশ। কদিন আগে ইয়েমেন থেকে পাল্টা জবাব হিসেবে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়েছে। এতে ভেঙে পড়া রিয়াদ-তেহরান সম্পর্কে আরো তেঁতে উঠেছে।

সৌদি আরবের দৃঢ় পদক্ষেপ সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় ইরান এগিয়ে। নভেম্বরের প্রথম দিকে সাদ হারিরিকে লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেও সফল হননি বিন সালমান। শেষ পর্যন্ত হারিরি তার পদেই টিকে যান। খবরটি ছিল তেহরানের জন্য স্বস্তিকর। রিয়াদের অভিযোগ, লেবাননের প্রভাবশালী শিয়া মিলিশিয়া গ্রুপ হিযবুল্লাহর পৃষ্ঠপোষকতা করছেন হারিরি। এ কারণে তাকে সরিয়ে হিযবুল্লাহকে কোণঠাসা করতে চেয়েছিলেন বিন সালমান; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি সফল হননি। তবে হারিরিকে নিয়ে সৌদি আরবের পরবর্তী পরিকল্পনা কি হতে পারে তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ইরাক থেকে সিরিয়া এরপর লেবানন ও ইয়েমেন- সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধে দেশগুলো এখন ইরানের প্রভাব বলয়ের মধ্যে। অপরদিকে উপসাগরীয় দেশ কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে ইরান। সম্প্রতি কয়েকটি উপসাগরীয় দেশকে নিয়ে কাতারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে ইরানের সহযোগিতায় কাতার অর্থনৈতিকভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে সমর্থ হয়। কাতার দেখিয়ে দিয়েছে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কিভাবে টিকে থাকতে হয়। ইয়েমেনে শিয়া হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষমতার বাইরে রাখতে দেড় বছরের বেশি সময় ধরে দেশটিতে সৌদির সামরিক অভিযান অব্যাহত আছে। এতে সৌদি আরবের অর্জন হলো পুরো ইয়েমেন হুতিদের দখলে চলে যায়নি। বাব আল মান্দিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণও তারা নিতে পারেনি। ফলে ইয়েমেনকে ইরান এখনো নিজেদের ঘাঁটি বানাতে পারেনি; কিন্তু এর ফলে অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি যুুদ্ধে জড়িয়ে গেছে সৌদি আরব। যুদ্ধ শেষ হওয়ার আশু কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধের ফলে ইয়েমেন মানবিক সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। দুর্ভিক্ষের শিকার ক্ষুধার্ত, হাড্ডি চর্মসার শিশুদের ছবি প্রায়ই আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশ পাচ্ছে যা রিয়াদের ভাবমূর্তি করে তুলছে তমসাচ্ছন্ন।

২০০৫ সালের মার্চে লেবাননে সিরিয়ার শাসক বাশার আল আসাদের বিরোধীদের নিয়ে একটি রাজনৈতিক জোট গঠিত হয়। মার্চ ১৪ মুভমেন্ট নামে ওই জোটের পৃষ্ঠপোষক ছিল সৌদি আরব। এটি ছিল ইরান (হিযবুল্লাহ) ও সিরিয়া বিরোধী একটি জোট। পরের বছর ২০০৬ সালের জুলাই-আগস্টে ইসরাইল-লেবানন যুদ্ধে ওই জোটের রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ শেষ হয়ে যায়। ৩৪ দিনের ওই যুদ্ধটি কার্যত হয়ে উঠেছিল ইসরাইল-হিযবুল্লাহ যুদ্ধ। যুদ্ধ শেষে হিযবুল্লাহর প্রতি লেবাননের জনগণের সমর্থন বেড়ে যায়। ওই বছর নভেম্বরে সাদ হারিরির নেতৃত্বে গঠন করে মার্চ ১৪ মুভমেন্ট নামে আরেকটি জোট। এই জোটটি ২০০৮ সালের মে মাসে সৌদি সমর্থিত মার্চ ১৪ মুভমেন্টকে কার্যত বিলুপ্ত করে দেয়। ওই সময় হিযবুল্লাহ রাজধানী বৈরুতের একটি অংশ সরাসরি দখল করে নিয়েছিল। গত বছর ডিসেম্বরে লেবাননের যে মন্ত্রিসভা গঠিত হয় তাতে হিযবুল্লাহ সদস্যদেরই প্রাধান্য লক্ষ্য করা গেছে। শেষ হিযবুল্লাহরই পছন্দে মিশেল আওনকে দুই মাস আগে দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে পার্লামেন্ট। এভাবে লেবাননকে নিজের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইরান। সৌদি আরব প্রাথমিকভাবে লেবনিজ সেনাবাহিনীর আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দিয়ে ও পরে হারিরিকে জোর করে পদত্যাগের ব্যর্থ চেষ্টা চালায়।

২০১১ সালে সিরিয়ায় আসাদকে উত্খাতের লক্ষ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হিযবুল্লাহর মিলিশিয়ারা এতে আসাদের পক্ষে অংশ নিয়েছে। এখানেও ইরানের প্রভাব ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি সৌদি আরব। আসাদকে টিকিয়ে রাখতে ইরান আর্থিক, সামরিক, সরঞ্জামাদি ও প্রশিক্ষণ কোনো দিক দিয়েই প্রচেষ্টা রাখেনি ইরান। ইরানের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ সেখানে স্থানীয় মিলিশিয়ার উদ্ভব ঘটিয়েছে। আসাদবিরোধী মিলিশিয়া গ্রুপগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সরঞ্জামাদি দিয়ে সহায়তা করলেও এই সহায়তার একটি বড় অংশ আসাদের পক্ষে লড়া ইরানের মদদপুষ্ট মিলিশিয়াদের হাতে গিয়ে পড়ে। অন্যদিকে সৌদি আরব ও অন্যান্য আরব দেশগুলো আসাদবিরোধী সশস্ত্র গ্রুপগুলোকে সহায়তা করলেও পরিকল্পনা মতো না হওয়ায় তা শেষ পর্যন্ত কাজে আসেনি বরং কিছু চরমপন্থি গ্রুপের জন্ম হয়েছে।

যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইরাকেও এখন ইরানের প্রভাব প্রবল। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সব দিক দিয়ে ইরাককে গাঁটছড়া বাঁধতে হয়েছে ইরানের সঙ্গে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সরাসরি তত্ত্বাবধানে ১ লাখ ২০ হাজার সেনা সদস্য নিয়ে ইরাকে গঠন করা হয়েছে পপুলার মোবিলাইজেশন ইউনিট (পিএমইউ)। মাসখানেক আগে জঙ্গি গ্রুপ আইএসের দখল থেকে মসুল ও কিরকুক অভিযানে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে ইরানি সৈন্যরাও যে অংশ নিয়েছে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল আবাদি তা স্বীকারও করেছেন। ক্ষমতাসীন ইসলামিক দাওয়া পার্টির সঙ্গে ইরানের সুসম্পর্ক রয়েছে। দলটি ইরানপন্থি হিসেবে পরিচিত। প্রধানমন্ত্রী আবাদি অক্টোবরে সৌদি আরব সফর করেছেন। ২৭ বছর পর এই প্রথম কোনো ইরাকি সরকার প্রধান সে দেশ সফরে গেলেন। যুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত দেশটি পুনর্গঠনে সৌদি বিনিয়োগ একান্ত প্রয়োজন, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে রিয়াদ সহযোগিতার হাত কতটুকু সম্প্রসারিত করতে রাজি হয়েছে তা জানা যায়নি। সব মিলিয়ে ইরান মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আছে বলে মনে হয়। সৌদি আরব যেখানে শুধু প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা করছে, ইরান সেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয়ভাবে নিজের শক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে। সারা মধ্যপ্রাচ্যে ইরান অনেক প্রক্সি শক্তি তৈরি করেছে যারা তেহরানের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। বিপরীত দিক থেকে রিয়াদের তেমন কিছু চোখে পড়ে না। বরং দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে দূরে ঠেলে দিচ্ছে রিয়াদ। ইরানের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রও ইসরাইলকে কাছে টানার চেষ্টা করছে। আদর্শিক মিল না থাকায় এতে করে সৌদি আরব কতটুকু কী অর্জন করবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়।

Leave a Reply