রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘে প্রস্তাব পাস, মিয়ানমারের পক্ষে মাত্র ১০ ভোট

un
জাতিসংঘের এজেন্ডা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যু গৃহীত হয়েছে। এতে ভোটাভুটির মাধ্যমে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধের প্রস্তাব পাস করেছে সদস্য রাষ্ট্রগুলো। প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনসহ ১৩৫টি দেশ ভোট দিয়েছে। বিপক্ষে ভোট দিয়েছে চীন, রাশিয়াসহ ১০টি দেশ। তবে ভোট দানে বিরত থেকেছে ভারতসহ ২৬টি দেশ।
বৈঠকে রোহিঙ্গাদের ওপর সামরিক অভিযান বন্ধে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে আহবান জানানো হয়। সেইসাথে দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে আসার এবং এবং তাদের পূর্ণ নাগরিকত্বের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়।
বৃহস্পতিবার জাতিসংঘে ৫৭ মুসলিম দেশের সংগঠন ওআইসির আহবানে এ ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণ পরিষদের মানবাধিকার কমিটি এ ভোটাভুটি অনুমোদন করে।
এতে মিয়ানমারের ঘনিষ্ট প্রতিবেশী চীন, সেইসাথে রাশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও লাওসসহ ১০টি দেশ বিপক্ষে অবস্থান নেয়। এদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে জড়িয়ে পড়া বাংলাদেশের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে দেশটির ঘনিষ্ট মিত্র ভারত। সেইসাথে দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ ২৬টি দেশ এ ভোটাভুটিতে নিজের অবস্থান জানাতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। রাখাইনে গণহত্যার শুরু থেকে ভারত সরকার এ ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে আছে দাবি করা হলেও এ ভোটাভুটিতে তারা অংশ নেওয়ায় বিরত থাকে।
উল্লেখ্য, গত ২৫ আগস্ট রাখাইনের রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার পর মিয়ানমার সেনাবাহিনী সেখানে জাতিগত নিধন শুরু করে। তাদের সাথে যোগ দেয় স্থানীয় উগ্রবাদী বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী। নির্বিচারে হত্যা, গণধর্ষণ, নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিদগ্ধের শিকার হয়ে প্রায় ৬ লাখ ২০ হাজারের মত রোহিঙ্গা পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। আক্রান্ত এ সব মানুষকে আশ্রয় দিতে বাংলাদেশ সরকার দেশটির সীমান্ত খুলে দেয় এবং তাদের পাশে দাঁড়ায়।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাসকৃত উপরোক্ত প্রস্তাবটির ফলে মিয়ানমার সরকারের ওপর একটি বড় বাড়তি চাপ পড়বে সন্দেহ নেই। বিপুলসংখ্যক দেশ মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে তাদের নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধে একমত হয়েছে, এটি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে নিশ্চয়ই। কিন্তু চীন ও রাশিয়ার মতো দুটি বৃহৎ রাষ্ট্র, যারা সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী বটে, প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দেয়ায় কিছু প্রশ্নের উদ্ভব হওয়াটাই স্বাভাবিক। ‘মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি’ শিরোনামে প্রস্তাবটি তুলেছিল ইসলামী রাষ্ট্রগুলোর সংগঠন ওআইসি। এ প্রস্তাবে রোহিঙ্গা সংকট থেকে উত্তরণের নিমিত্তে বেশকিছু দিকনির্দেশনাও রয়েছে। বিশেষত চীন ও রাশিয়া বিপক্ষে ভোট দেয়ায় এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, দেশ দুটি রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় না। হতে পারে মিয়ানমারের সঙ্গে বিপক্ষে ভোটদানকারী দেশগুলোর বিশেষ স্বার্থ রয়েছে। কিন্তু সে কারণে এত ব্যাপক আকারের একটি মানবিক সমস্যা সমাধানের প্রস্তাবটি তারা যে সমর্থন করল না, এটা পরিতাপের বিষয় বৈকি। রোহিঙ্গা নিধন ও বিতাড়নকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কারণ এটি একদিকে একটি বড় জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্বের প্রশ্ন, অন্যদিকে তা বাংলাদেশের জন্য তৈরি করেছে বহুমাত্রিক ঝুঁকি। বস্তুত এটি একটি বড় মাপের সংকটও বটে, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমস্যার ডালপালা বিস্তার করতে পারে। আমরা চীন ও রাশিয়ার ভূমিকায় মর্মাহত ও হতাশ হয়েছি।
বিশেষত ভারত যে ভোটদানে বিরত থেকেছে, সেটাও আমাদের বিস্মিত করেছে। ভারতীয় নেতারা মুখের কথায় বাংলাদেশকে বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী হিসেবে আখ্যা দেন, অথচ বাংলাদেশেরই এক বড় সংকটে তারা নিষ্ক্রিয় থাকবেন- এটা পররাষ্ট্রনীতিতে তাদের বৈপরীত্যই প্রমাণ করে। আমরা চাইব- চীন, রাশিয়া, ভারতসহ যেসব দেশ বিপক্ষে ভোট দিয়েছে অথবা ভোটদানে বিরত থেকেছে, তাদের ভাবান্তর হবে এবং নতুন চিন্তার আলোকে তারা রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশের পক্ষে কার্যকর অবস্থান নেবে।

Leave a Reply