শাস্তি ‘না থাকায়’ গবেষণা চুরিতে ঢাবি শিক্ষকরা?

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষক সামিয়া রহমান। তবে সংবাদকর্মী হিসেবেই তিনি সুপরিচিত। অন্যদিকে সংবাদকর্মী থেকে ঢাবির শিক্ষক হন মাহফুজুর রহমান মারজান। এ দুজনই ঢাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। সামিয়া নিজ বিভাগের শিক্ষক হলেও মারজান ক্রিমিনোলজি (অপরাধ বিজ্ঞান) বিভাগের শিক্ষক হন।

সম্প্রতি অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনায় সংবাদের শিরোনাম হন এই দুই শিক্ষক। ঢাবির সোশ্যাল সায়েন্স রিভিউতে তাদের প্রকাশিত এক লেখায় দুজন বিশ্বখ্যাত গবেষকের লেখা চুরির অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই সর্বত্র সমালোচনার ঝড় উঠে। অভিযোগ ও সমালোচনা আরো গাঢ় হয়েছে যখন এই দুই শিক্ষক বিষয়টি নিয়ে একে অপরের প্রতি কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু করেন।
শুধু এটিই নয়, দুজনেরই প্রকাশিত একাধিক লেখায় অনৈতিকতার অভিযোগ উঠেছে। সামনে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান, শিক্ষকদের ব্যক্তিত্ব, সম্মানবোধ এবং নিজেদের দলাদলির বিষয়টি।
অবশ্য ঢাবি শিক্ষকদের বিরুদ্ধে গবেষণা চুরির অভিযোগ নতুন নয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো বেশ কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে সামিয়া-মারজান কেলেঙ্কারির মতো অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ‘শাস্তিমূলক ব্যবস্থা’ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু একজন শিক্ষকের আদর্শ এবং সম্মানের জায়গা থেকে গর্হিত এই অপরাধের শাস্তির মাত্রা কতটুকু?
চলতি বছর এ ধরনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আবু সায়েমের পদাবনতি ঘটিয়ে তাকে সহকারী অধ্যাপক করা হয়েছে।
এ অভিযোগের শাস্তি চূড়ান্ত করতে গিয়ে সিন্ডিকেট সদস্যরা বলেন, আগামী দুবছর আবু সায়েমকে পদোন্নতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ করেন ফার্সি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবু মূসা মো. আরিফ বিল্লাহ।
অভিযোগে বলা হয়, আবু সায়েম তার গবেষণায় আরিফ বিল্লাহর একটি প্রবন্ধের কিছু অংশ কোনো সূত্র উল্লেখ ছাড়াই নিজের বলে চালিয়ে দিয়েছেন। পরে এটি নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি হয়। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে আবু সায়েমের পদাবনতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তদন্ত কমিটির অনুসন্ধান সাপেক্ষে ঢাবির আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আ জ ম কুতুবুল ইসলাম নোমানীকে গত বছর সহযোগী অধ্যাপক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদাবনতি দেওয়া হয়। এর আগে তিনি পিএইচডি গবেষণায় নকল করেছেন বলে অভিযোগ উঠলে সিন্ডিকেট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।
এছাড়াও গত বছর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষককেও একই ধরনের অভিযোগে পদাবনতি দিয়ে শাস্তি দেওয়া হয়। তবে শিক্ষক হয়ে এ ধরনের চৌর্যবৃত্তি করায় পদাবনতিই কি শাস্তি হিসেবে যথেষ্ট?
সোম ও মঙ্গলবার ঢাবির বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে কথা হয় সামিয়া-মারজান কেলেঙ্কারি নিয়ে। এনিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই নিজেদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নাম প্রকাশ করেননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একজন ছাত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘সামিয়া রহমান এবং মাহফুজুর রহমান মারজান যা করেছেন তাতে এই বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা সবাই লজ্জিত।’
তিনি বলেন, ‘যে জার্নালটিতে এই দুজনের লেখা প্রকাশ হয়েছে তার ১৮টি ভলিউমে কয়েকশ’ লেখা গত কয়েক বছরে প্রকাশিত হয়েছে। সঠিক তদন্ত হলে এর একটি বড় অংশেই চৌর্যবৃত্তির প্রমাণ মিলবে।’
ছাত্রছাত্রীদের আরো কয়েকজন বলেন, মূলত নিজ অনুগত শিক্ষকদের খুশি রাখতে কোনো মান না দেখেই গবেষণার নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব জার্নালে মুখচেনাদের লেখা প্রকাশ করা হয়।
জানতে চাইলে সামিয়া-মারজান কেলেঙ্কারির সময় সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের ডিনের দায়িত্ব পালন করা এবং বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদ পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘শাস্তি তো হচ্ছে। এখন তদন্ত কমিটি হয়েছে।’
শাস্তি কী- জানতে চাইলে ফরিদ উদ্দিন দাবি করেন, ‘অভিযোগ প্রমাণিত হলে যথাযথ শাস্তি হয়।’
এবিষয়ে তৎকালীন ঢাবি উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকী পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘এসব অভিযোগে সর্বোচ্চ শাস্তি পদাবনতি, পদোন্নতি না দেওয়া এবং তিরস্কার।’
সামিয়া-মারজান গবেষণা কেলেঙ্কারির জন্য ঢাবির গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান উপ-উপাচার্য নাসরিন আহমেদ। তিনি পরিবর্তন ডটকমকে জানান, সিন্ডিকেট যে তদন্ত কমিটি করেছে সে বিষয়ে তিনি আজও (বুধবার) কোনো অফিসিয়াল চিঠি পাননি। তাই কী কাজ তাও বিস্তারিত কিছু এখন বলার নেই।
কবে নাগাদ তদন্তের কাজ শুরু হবে- জানতে চাইলে নাসরিন আহমেদ বলেন, ‘সিন্ডিকেট থেকে কাগজ পেলেই কাজ শুরু করব।’

Source : http://www.poriborton.com/hall/75482

Leave a Reply